উৎসবের রঙে সাজছে...
রাজনীতি

হাত মেলানো, ফ্যামিলি কার্ড, আর রাজনীতির ভাষা: নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ভাইরাল পোস্ট কী বলছে

হাত মেলানো, ফ্যামিলি কার্ড, আর রাজনীতির ভাষা: নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ভাইরাল পোস্ট কী বলছে
লেখা বড়/ছোট করুন:

রমজানের ইফতার রাজনীতি বাংলাদেশে পরিচিত বিষয়। তবু নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর এই পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, কারণ তিনি খুব সহজভাবে রাজনীতির কয়েকটি সত্য দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি সব দলের শীর্ষ নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ইফতার পরিবেশনকারী কর্মী, আর নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও হাত মেলানোর চেষ্টা করেছেন। তারপর তিনি কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথন তুলে ধরেন। এই কথাগুলো তিনটি বড় ইঙ্গিত দেয়। এক, রাজনীতিতে সৌজন্য দেখানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই, জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি অনেক সময় ভোটের কৌশল হয়ে যায়। তিন, “ভাই” ভাষা রাজনীতিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতো করে তোলে।

১) হাত মেলানো একটি ইমেজ তৈরি করে

তিনি যখন বলেন যে তিনি কর্মী আর নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছেন, তখন তিনি নিজেকে “সবাইকে সম্মান করি” এমন একজন হিসেবে দেখান। এতে তিনি জনপ্রিয়তা বাড়ানোর একটি পরিচিত কৌশল ব্যবহার করেন। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। তিনি দেখান যে তিনি শুধু ক্ষমতাবানদের কাছে যান না।

একই সঙ্গে পোস্টটি আরেকটা সত্য দেখায়। ভিন্ন মতের রাজনীতিকরা জনসমক্ষে সংঘাত দেখান, কিন্তু বড় অনুষ্ঠানে তারা একই জায়গায় বসেন। সাধারণ মানুষ এই দ্বৈততা অনেকদিন ধরে দেখে। তাই এই অংশটা মানুষ দ্রুত ধরতে পারে।

২) “দোয়া” এবং “দাওয়াহ” ধর্মীয় ভাষায় রাজনীতি করে

জামায়াতে ইসলামীর আমীরের কথাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “তোমার জন্য দোয়া ও দাওয়াহ দুইটাই রইলো।” এই বাক্যটি একসঙ্গে দুই কাজ করে। প্রথমত, তিনি শুভকামনা জানান। দ্বিতীয়ত, তিনি ধর্মীয় আহ্বানও দেন। এটি ধর্মীয় বৈধতা এবং প্রভাব তৈরি করার একটি সাধারণ কৌশল। লেখক এই কথাটি উদ্ধৃত করে দেখান যে রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাষা কীভাবে নরমভাবে কাজ করে।

৩) “ফ্যামিলি কার্ড” কথায় কল্যাণ কম, ভোটের হিসাব বেশি

তারেক রহমানকে বলা “ফ্যামিলি কার্ড” প্রসঙ্গ সবচেয়ে রাজনৈতিক অংশ। লেখক বলেন, বাসার বুয়া প্রতিদিন ফ্যামিলি কার্ড চায়। তিনি এটাকে নির্বাচনে জেতার কৌশলও বলেন। তারেক রহমান উত্তর দেন যে খুব শিগগিরই এটি সারা দেশে চালু হবে। এখানে দুইটা বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, মানুষ এখন সহায়তা চায় এবং তা দৈনন্দিন জীবনের কথা দিয়ে প্রকাশ করে। দুই, রাজনৈতিক নেতা দ্রুত এটাকে বড় প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেন, কারণ এতে ভোটের লাভ আছে।

এই অংশে পোস্টটি জনকল্যাণের রাজনীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সহায়তা যদি কেবল ভোটের জন্য হয়, তাহলে নীতির বদলে প্রচারণা শক্তিশালী হয়। এতে রাষ্ট্রের দায়িত্বও দলীয় সুবিধার মতো দেখায়।

৪) বিচার, আমন্ত্রণ, আর সম্পর্কের রাজনীতি

লেখক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে শহীদ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত করার কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে সময় লাগবে। এই কথোপকথন পরিচিত। ক্ষমতাবানরা প্রায়ই সময়ের কথা বলেন। সাধারণ মানুষ দ্রুত ফল চায়। এই ফাঁকে অবিশ্বাস বাড়ে।

আরেকদিকে মঈন খান তাকে বাসায় আসতে বলেন। এতে দেখা যায়, রাজনীতিতে সম্পর্ক তৈরি করা এখনো খুব বড় ব্যাপার। ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ অনেক সময় বড় সিদ্ধান্তের দরজাও খুলে দেয়।

৫) “ভাই-ছোট ভাই” ভাষা রাজনীতিকে ব্যক্তিগত করে তোলে

সবশেষে আব্বাস ভাইয়ের সঙ্গে কথাগুলো পোস্টকে আরও ভাইরাল করে। “দুষ্টুমি করবা না” এবং “ছোট ভাইয়ের সিট এভাবে কেড়ে না নিয়ে ছেড়ে দিলেও পারতেন” এই সংলাপ মজার মনে হলেও এখানে কঠিন অভিযোগ আছে। লেখক আসলে বলেন যে কেউ তার “ছোট ভাইয়ের সিট” নিয়েছে। তিনি ক্ষমতা, আসন, এবং প্রভাবকে পারিবারিক সম্পর্কের ভাষায় প্রকাশ করেন। এই ভাষা রাজনীতিকে জনস্বার্থের জায়গা থেকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জায়গায় নিয়ে যায়। এতে মানুষ রাজনৈতিক সংঘাতকে নাটক হিসেবে দেখে, নীতি হিসেবে দেখে না।

এই পোস্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই পোস্ট মানুষকে দেখায় যে রাজনীতির বড় অংশ এখন কথার লড়াই, ইমেজ, আর নরম সম্পর্কের খেলা। ইফতারের সৌজন্য অনেক সময় বাস্তব বিরোধ ঢেকে দেয়। কল্যাণ প্রকল্প অনেক সময় ভোটের কৌশল হয়। আর “ভাই” ভাষা অনেক সময় জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সত্যি বদলাতে চায়, তাহলে তাকে সংলাপের ছবি নয়, নীতির প্রমাণ দিতে হবে। তাকে সহায়তার প্রকল্পকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর তাকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাষা থেকে বের হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ভাষায় ফিরতে হবে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!